সংসদে নতুন পরিকল্পনা জানালেন রেলমন্ত্রী

সব জেলায় রেল পৌঁছাতে নতুন প্রকল্প, বাড়ছে কোচ-লোকোমোটিভ

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
storage/2026/september/09/news/bangladesh-railway-new-coaches-parliament_6aa15d5ea8544-1788960094.jpg

বাংলাদেশের সব জেলাকে পর্যায়ক্রমে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে যাত্রীসেবা বাড়াতে ২০০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ ও আরও ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০০ ব্রডগেজ ক্যারেজের প্রথম চালানে ১৯টি চলতি সেপ্টেম্বরেই পাওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি মিটারগেজ ও ব্রডগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের কাজও বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।

রেলমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের রুট হিসেবে রেলপথের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৪২৮ কিলোমিটার। ট্র্যাকের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৮২৮ কিলোমিটার। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ধাপে ধাপে দেশের সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

বাড়ছে কোচ ও লোকোমোটিভ
যাত্রী চাহিদার তুলনায় আসন কম থাকায় আন্তঃনগর ট্রেনের নন-এসি কোচের মোট আসনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আসনবিহীন বা স্ট্যান্ডিং টিকিট দেওয়া হচ্ছে বলে সংসদে জানান রেলমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিভিন্ন ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করার পরও অনেক সময় যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী আসন দেওয়া সম্ভব হয় না। জরুরি প্রয়োজনে অনেক যাত্রী ট্রেনে উঠে পড়েন। এ কারণে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে নন-এসি কোচের মোট আসনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যান্ডিং টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দীর্ঘ যাত্রায় ভোগান্তি তৈরি করছে উল্লেখ করে রেলমন্ত্রী বলেন, এ সমস্যা কমাতে ট্রেন ও কোচের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বেশি যাত্রী চলাচল করে এমন রুটে ট্রেন ও কোচ বাড়ানোর পাশাপাশি ঈদ, পূজা এবং বিভিন্ন সরকারি ছুটিতে অতিরিক্ত বিশেষ ট্রেন চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে পর্যায়ক্রমে স্ট্যান্ডিং টিকিট কমানো বা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে ২০০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। এর প্রথম চালানে ১৯টি ক্যারেজ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে পাওয়ার কথা রয়েছে। আরও ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ সংগ্রহের জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে।

লোকোমোটিভ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রকল্প এগোচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের বিড ডকুমেন্ট চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে আরও ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এ ছাড়া কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের অর্থায়নে ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের জন্য পিডিপিপি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসব রোলিংস্টক যুক্ত হলে আরও বেশি ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে জানান মন্ত্রী। এতে রেলসেবার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য সেবা আরও আধুনিক, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সব জেলায় রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণে বর্তমানে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মধুখালী থেকে কামারখালী হয়ে মাগুরা শহর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ, শেরপুর থেকে রৌমারী রেল যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কর্ড লাইন নির্মাণ।

এ ছাড়া আরও তিনটি রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ, নেত্রকোনার ঝারিয়া ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন এবং সিলেট থেকে জাফলং পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা।

রেলমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে আরও প্রকল্প নেওয়া হবে, যাতে ধীরে ধীরে দেশের সব জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসে।

ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রেন চলছে, যাত্রীবাহী ট্রেন ফেরানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে কোনো যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে না। তবে দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে। রহনপুর, দর্শনা ও বেনাপোল ইন্টারচেঞ্জ স্টেশনের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রেন গ্রহণ করা হচ্ছে এবং খালি রেক ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

রেলমন্ত্রী জানান, গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪৩টি পণ্যবাহী ট্রেন বাংলাদেশে আসে এবং প্রায় ৪২টি খালি রেক ফেরত যায়। ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রেনের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী, কলকাতা, রাজশাহী রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর বিষয়টি বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।

ঢাকায় যানজট কমাতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ
সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী হিসেবেও শেখ রবিউল আলম জানান, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপন করা হলে তেজগাঁও টোল প্লাজাসহ পুরো এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

বর্তমানে কাওলা থেকে এফডিসি ক্রসিং পর্যন্ত চালু থাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের তেজগাঁও ও বিমানবন্দর টোল প্লাজায় তুলনামূলক বেশি চাপ রয়েছে। উত্তরাংশে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বর্তমানে তেজগাঁও টোল প্লাজার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

মন্ত্রী জানান, সোনারগাঁও গোলচত্বর থেকে নতুন র‌্যাম্প নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি ঢাকা, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরির জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও চলছে। এই সংযোগ তৈরি হলে টোল প্লাজার ওপর চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

যানজট ও ধীরগতি কমাতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে অটোমেটিক ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। বিমানবন্দর, কুড়িল, বনানী ও তেজগাঁও টোল প্লাজার মোট সাতটি লেনে এই প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। ইটিসির আওতায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৭৭টি গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে।

ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ অনুমোদিত নয়
সংসদে রেলমন্ত্রী আরও জানান, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বাংলাদেশ রেলওয়ের অনুমোদিত কোনো ব্যবস্থা নয়। বিভিন্ন উৎসবের সময় যাত্রীদের অনেকে জোর করে ট্রেনের ছাদে উঠে ভ্রমণ করেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ছাদে যাত্রী বহন বন্ধে কারিগরি দিক বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। রেলওয়ের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দুর্ঘটনায় কোনো যাত্রী নিহত হলে তার পরিবার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিধান রয়েছে বলেও সংসদে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে বাড়তে পারে আন্তঃনগর ট্রেন
বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচের স্বল্পতা রয়েছে বলেও সংসদে জানান রেলমন্ত্রী। পর্যাপ্ত সংখ্যক মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচ পাওয়া গেলে ঢাকা, কুড়িগ্রাম, ঢাকা রুটে মধ্যমেয়াদে এক জোড়া এবং দীর্ঘমেয়াদে আরও এক জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে এই রুটে মোট দুই জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ঢাকা, জয়দেবপুর সেকশনের রেলস্টেশনগুলো বিভিন্ন সময়ে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী সেকশনের স্টেশনগুলো ‘জয়দেবপুর, ঈশ্বরদী সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ’ প্রকল্পের কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে আধুনিকায়ন করা হবে।

এ ছাড়া বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় সফাদারপুর, বগুড়া ও কাহালু স্টেশন রিমডেলিং করা হবে। একই প্রকল্পে নতুন আরও আটটি স্টেশন নির্মাণের কথা রয়েছে।

বগুড়া থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত বিদ্যমান রেলস্টেশনগুলোও বাজেট পাওয়া সাপেক্ষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে আধুনিকায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে