দেশের উন্নয়ন ও সরকারি কার্যক্রম বাধাগ্রস্তকারীদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, রাজনীতির নামে শৃঙ্খলা ভঙ্গ কিংবা সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করলে তাদের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। দেশের মানুষ উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টিকারীদের ক্ষমা করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম পুরাতন রেলস্টেশন চত্বরে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত র্যালিপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আমীর খসরু।
সমাবেশে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের বাজেট নিয়েও কথা বলেন তিনি। আমীর খসরু বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে সংকটকাল অতিক্রম করছে। এমন পরিস্থিতিতেও বিএনপি বড় বাজেট দেওয়ার সাহস দেখিয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের ঘোষিত বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।”
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গে আমীর খসরু দাবি করেন, দেশ যখনই গভীর সংকটে পড়েছে, বিএনপি তখনই সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করেছে। তাঁর ভাষায়, “আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার মিলে দেশকে গর্তের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দেশের মানুষ যখনই গভীর সংকটে পড়েছে, তখন বিএনপি বারবার সেই সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করেছে।”
জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরেন তিনি। জনগণ যে প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আত্মত্যাগ করেছে, তা পূরণে বিএনপি কাজ করে যাবে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।
সমাবেশে স্থানীয় পর্যায়ে মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আমীর খসরু বলেন, “এলাকায় কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা চাঁদাবাজ থাকলে তাদের আইনের হাতে তুলে দিতে হবে।”
অনুষ্ঠানে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মহানগর বিএনপির নেতারা বক্তব্য দেন।
সমাবেশ শেষে পুরাতন রেলস্টেশন চত্বর থেকে র্যালি বের করেন দলটির নেতাকর্মীরা। ব্যানার, ফেস্টুন, দলীয় ও জাতীয় পতাকা নিয়ে এতে অংশ নেন তারা। ঢাকঢোলের সঙ্গে র্যালিটি নগরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে লালদীঘি চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে তিনি দেশের ইতিহাসে শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বাজেট দেওয়া হয়েছে বলে জানান।
তিনি বলেন, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণাকে এবারের বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের আধুনিক, দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণার জন্যও বাজেটে বড় অংশ রাখা হয়েছে। গবেষণার ক্ষেত্রে কোথায় সমস্যা রয়েছে, পর্যাপ্ত সুবিধার ঘাটতি কোথায় এবং সক্ষমতার অভাব কোন জায়গায়, তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চুয়েটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহ থাকলেও পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকার কথা তারা জানিয়েছেন। এ কারণে গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ফ্যাকাল্টির ঘাটতি থাকলে সেটিও চিহ্নিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
চুয়েটে ৯৫ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা গবেষণায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। শুধু পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেই হবে না, সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগও থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চুয়েটকে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে নিয়মিত বেঞ্চমার্ক করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী।
সরকারি অর্থের অপচয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলেও চুয়েটের অনুষ্ঠানে স্পষ্ট করেন আমীর খসরু। সরকারি প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে অর্থের সঠিক ব্যবহার ও বিনিয়োগের প্রতিদান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী জানান, কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে তিনি চারটি বিষয় বিবেচনা করেন। বিনিয়োগের বিপরীতে অর্থের যথাযথ মূল্য পাওয়া যাবে কি না, প্রকল্প থেকে কী ধরনের রিটার্ন আসবে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে কি না এবং পরিবেশগত দিক সুরক্ষিত থাকবে কি না, এসব বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, এই চার শর্ত পূরণ না হলে তাঁর কাছে প্রকল্প না আনতে। কারণ প্রকল্পে ব্যবহৃত অর্থ সাধারণ করদাতাদের। কোনো অবস্থাতেই সেই অর্থের অপচয় মেনে নেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
চুয়েটের আইটি ইনকিউবেটর নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। প্রায় ২৪ বছর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে ঢাকায় একটি আইটি ইনকিউবেটর করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে সরকারগুলোর ধারাবাহিক উদ্যোগ ও তদারকির অভাবে সেখান থেকে পুরোপুরি সুবিধা নেওয়া যায়নি।
চুয়েটের আইটি ইনকিউবেটরেও বড় ধরনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হয়েছে উল্লেখ করে এই বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
একই প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নিয়ন্ত্রণ থাকলে কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন আমীর খসরু। তাঁর মতে, চুয়েট ক্যাম্পাসের ভেতরের বিষয় হওয়ায় আইটি ইনকিউবেটরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়া উচিত। সেখান থেকে কী ধরনের আউটপুট আসবে, তার পরিকল্পনাও চুয়েটকেই করতে হবে।
ঢাকায় ফিরে আইসিটি মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে চুয়েটের উপাচার্যকে ঢাকায় এসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে জটিলতার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
চুয়েটের উপাচার্যের উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মানসিকতার প্রশংসাও করেন অর্থমন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির জন্য উপাচার্যের বেশ কিছু ভালো ধারণা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কাজ করলে অল্প সময়ে চুয়েটকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
চুয়েটের বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীও বক্তব্য দেন। দেশের অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চুয়েটের গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও গবেষণায় অর্থের অভাবে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ যাতে থেমে না যায়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শুধু লেখাপড়া নয়, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, বিতর্ক ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথাও বলেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুয়েটের সহযোগিতা বাড়িয়ে নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ তৈরির ওপর জোর দেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। এলাকার সন্তান হিসেবে চুয়েটের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় সবসময় পাশে থাকার আশ্বাসও দেন তিনি।