দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত ই-কমার্স আজ বহুমুখী সংকটের মুখে। একসময় দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভোক্তা, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করা এ খাত এখন ব্যবসা সংকোচন, লোকসান, বিনিয়োগ হ্রাস এবং আস্থার সংকটে প্রবৃদ্ধির গতি হারাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত করা এবং ডেলিভারি হাব বন্ধের ঘটনা সেই সংকটকেই আরও স্পষ্ট করেছে। এই পরিস্থিতির পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলারের উচ্চমূল্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন মূলধন সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি অতীতের কিছু আলোচিত প্রতারণার ঘটনাও এ খাতের প্রতি মানুষের বিশ্বাসে গভীর আঘাত হেনেছে। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও গ্রাহকের অর্থ ফেরত না পাওয়ার ঘটনা এখনো ভোক্তাদের মনে অনাস্থা তৈরি করে রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর। স্থানীয় পর্যায়ে ডেলিভারি হাব কমে যাওয়ায় পণ্য সরবরাহে সময় ও ব্যয় বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভোক্তা সন্তুষ্টি ও বিক্রির ওপর। একই সঙ্গে মার্চেন্টদের বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব ও পরিচালন সংকট ব্যবসায়িক সম্পর্ককেও দুর্বল করছে। উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো, দেশে বিপুলসংখ্যক ফেসবুকভিত্তিক বা অনলাইন ব্যবসা এখনো নিবন্ধনের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ভোক্তা সুরক্ষা দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একটি সুসংগঠিত ও জবাবদিহিমূলক বাজার গড়ে তুলতে নিবন্ধন, লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নজরদারির বিকল্প নেই। তবে সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশে বিপুলসংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ই-কমার্সকে এখনো একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে ধরে রেখেছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। এজন্য গ্রাহকের অর্থ ও অধিকার সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা, স্বচ্ছ লেনদেন, সময়মতো মার্চেন্টদের পাওনা পরিশোধ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং টেকসই ব্যবসায়িক মডেল নিশ্চিত করা জরুরি। ই-কমার্স কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই এই খাতকে শুধু বাজারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। কারণ ই-কমার্সের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নতুন গ্রাহক পাওয়ার ওপর নয়, বরং বিদ্যমান গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।