চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টি ও বন্যার প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক দুর্ভোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর অভিঘাত পড়েছে কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ১৫ হাজার ৯১১ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ কোটিরও বেশি। একই সঙ্গে প্রায় ২০ হাজার নলকূপ ও হাজারো স্যানিটেশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ অপরিহার্য। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আউশ ধান ও সবজিচাষিরা। বহু এলাকায় ফসল দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় নষ্ট হয়েছে, আবার আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে চাষাবাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক আর্থিক সংকটে পড়বেন। কৃষি খাতের এই ক্ষতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; ভবিষ্যতে স্থানীয় খাদ্য সরবরাহ, বাজারমূল্য এবং সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, বন্যার পর নিরাপদ পানির সংকট একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। নলকূপে দূষিত পানি প্রবেশ করায় ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত নয়, দ্রুত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, নলকূপ জীবাণুমুক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত, পুনর্বাসন এবং নিরাপদ পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এসব উদ্যোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বীজ, সার, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে তারা দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারবেন। পাশাপাশি বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায় যথাযথ প্রস্তুতি, দ্রুত সাড়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে। কৃষি পুনরুদ্ধার ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণই হতে পারে বন্যা-পরবর্তী সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।