নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক ও পর্যটক রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ ও দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান চললেও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।
বৃহস্পতিবার নেপাল পুলিশের সর্বশেষ আপডেটের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বন্যায় ৩৩২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর কিছুক্ষণ আগে স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৩০ মিনিটের হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ২৮৯। একই ঘটনায় নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান এর লাইভ আপডেটে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিখোঁজ থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
নেপালের পর্যটন বোর্ডের হিসাবে, নিখোঁজ ৬৪৪ পর্যটকের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি এবং ১২৭ জন নেপালি। ফলে নিখোঁজের সামগ্রিক সংখ্যা এবং পর্যটন বোর্ডের হিসাব এক নয়। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন সময়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করায় সংখ্যায় এই পার্থক্য রয়েছে।
দুর্যোগের পর নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানির সঙ্গে কাদা ও পাথরের স্রোত ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক জায়গায় উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগে ভারতীয় নাগরিকদের একটি বড় অংশও নিখোঁজ রয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বরাত দিয়ে আল জাজিরা ও বিবিসি জানিয়েছে, নেপালে ২৮৮ ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
এর মধ্যে ৭৩ জন নেপালের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করছিলেন বলে জানিয়েছেন জয়সওয়াল। ওই অঞ্চলটি বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। ভারতীয় দূতাবাস কাঠমান্ডুতে ওই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিখোঁজদের বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া প্রায় ২০০ ভারতীয় নাগরিক তিব্বতে আটকা পড়েছেন। জয়সওয়াল জানিয়েছেন, তাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে বেইজিংয়ে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে।
তিব্বতে আটকা পড়া ভারতীয়দের মধ্যে ৯৫ জন দারচেনে রয়েছেন। তারা বর্তমানে সীমান্তবর্তী শহর হিলসার দিকে যাচ্ছেন, সেখান থেকে নেপালে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আরও কিছু ভারতীয় জিলং ও জুপুলতুক এলাকায় রয়েছেন এবং তারাও নেপাল সীমান্তের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এখানে নিখোঁজ ও আটকা পড়া দুটি আলাদা পরিস্থিতি। ২৮৮ ভারতীয়কে নেপালে নিখোঁজ বা যোগাযোগহীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আর প্রায় ২০০ ভারতীয় তিব্বতে আটকা রয়েছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কৈলাস মানসসরোবর যাত্রায় যাওয়া ২১ ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। আল জাজিরা ও বিবিসি উভয় সূত্রেই এই তথ্য এসেছে।
অন্যদিকে বিবিসি জানিয়েছে, নেপাল সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবারের উদ্ধার অভিযানে ৩৫০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করেছে। তাদের মধ্যে ৫০ জন বিদেশি নাগরিক। উদ্ধার হওয়া বিদেশিদের মধ্যে ৩০ জন ভারতীয়, ৮ জন চীনা, ৮ জন কোরিয়ান, ২ জন মার্কিন এবং ২ জন ইতালীয় নাগরিক ছিলেন।
তবে ২১ ও ৩০ ভারতীয় উদ্ধারের এই দুই হিসাবের সময়সীমা বা হিসাবের পরিধি একই কি না, তা সূত্রের তথ্য থেকে স্পষ্ট নয়। তাই দুই সংখ্যাকেই সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব হিসেবে আলাদাভাবে রাখা হচ্ছে।
বন্যার সময় তিব্বতের দিকে কৈলাস মানসসরোবর যাত্রায় থাকা প্রায় ২০০ ভারতীয় আটকা পড়েন। তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বন্যায় নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে বিভিন্ন দেশের নাগরিকও নিখোঁজ হয়েছেন। আল জাজিরা জানিয়েছে, নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়, ব্রিটিশ, মার্কিন, অস্ট্রেলীয়, কানাডীয়, দক্ষিণ কোরীয়সহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
নেপালের পর্যটন বোর্ডের হিসাবেও বিদেশি পর্যটকদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে ৫০ লাখ পাউন্ড সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, বন্যায় সৃষ্ট পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
আল জাজিরা ও বিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য অর্থ সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে জরুরি উদ্ধারকারী দল নেপালে পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছে। ব্রিটিশ নাগরিকদের সহায়তার জন্য ওই অঞ্চলে কনস্যুলার সহায়তা কর্মী পাঠানোর কথাও জানিয়েছেন বার্নহ্যাম।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ ব্রিটিশ নাগরিক বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশন বা আইএফআরসি নেপালের দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। সংস্থাটির দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাবার, নিরাপদ পানীয় জল, জরুরি আশ্রয় সামগ্রী, প্রাথমিক চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। আইএফআরসি তাদের দুর্যোগ মোকাবিলা জরুরি তহবিল থেকে ৯ লাখ ৯৭ হাজার সুইস ফ্রাঁ ছাড় করেছে। এর মধ্যে জরুরি সহায়তা হিসেবে ১ লাখ সুইস ফ্রাঁ তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
নারী ও শিশুদের পাশাপাশি বয়স্ক মানুষ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার কথাও জানিয়েছে কেয়ার নেপাল।
বন্যার তাৎক্ষণিক কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো বিশ্লেষণ করছেন। তবে আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয় অঞ্চলে বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধস থেকে ভয়াবহ পানির স্রোত তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ পাহাড়ি এলাকায় পাথর ও বরফের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়াও এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনকে এই নির্দিষ্ট দুর্যোগের একমাত্র তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে দেখার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। ঘটনাটি কীভাবে শুরু হয়েছে, তা নিয়ে আরও বিশ্লেষণ চলছে।
নিউজিল্যান্ডের আর্থ সায়েন্সেসের মাউন্টেনস টু সি কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন উচ্চ পাহাড়ে পাথর ও বরফকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এর ফলে এ ধরনের ধস ও ধারাবাহিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকি থাকতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন ভূমিধস হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ চলছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট দিনে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে, তা আগে থেকে জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ধ্বংসস্তূপ ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চলছে।