রাজধানীর কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তির বাসিন্দাদের জন্য আধুনিক আবাসন নির্মাণে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রাথমিকভাবে সম্মতি জানিয়েছে চীন। একসঙ্গে পুরো অর্থ বিনিয়োগ সম্ভব না হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিনিয়োগ করবে দেশটি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান প্রতিমন্ত্রী।
মীর শাহে আলম বলেন, গুলশান ও ঢাকা-১৭ নির্বাচনি এলাকার কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তির বাসিন্দাদের জন্য আধুনিক আবাসন গড়ে তোলার প্রস্তাব চীনের কাছে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগে সম্মতি দিয়েছে চীন।
তিনি জানান, পুরো অর্থ একসঙ্গে বিনিয়োগ করা সম্ভব না হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অর্থ দেওয়া হবে। প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০তলা ভবনে ছোট ছোট আবাসিক ইউনিট নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ইউনিটের আয়তন হবে প্রায় ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০ বর্গফুট।
বর্তমানে এসব বস্তিতে যারা বসবাস করছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে নতুন আবাসনে পুনর্বাসন করা হবে। তাদের কাছ থেকে মাসিক ভাড়া নেওয়া হবে না। তবে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি ব্যবহারের খরচ বাসিন্দাদের বহন করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বস্তিতে বর্তমানে বসবাসরত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরির কাজ চলছে। কেউ যাতে বাদ না পড়েন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, "যারা আছে, আমরা অলরেডি তালিকা করছি এবং যারা আছে কেউ বঞ্চিত হবে না। সবাইকে দেওয়া হবে।"
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চীনের বিনিয়োগের বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আমিনবাজারের ল্যান্ডফিলে জমা বর্জ্য ব্যবহার করে একটি চীনা কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পে কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে বর্জ্য থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। এ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি আগামী ২ সেপ্টেম্বর চীনের বেইজিংয়ে হওয়ার কথা রয়েছে।
এরই মধ্যে প্রকল্পটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে চুক্তি হয়েছে। চূড়ান্ত অর্থায়ন চুক্তি বিনিয়োগকারী ব্যাংক, কোম্পানি ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে হবে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলে জমে থাকা বর্জ্য থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পাওয়ার চায়না কোম্পানিকে দ্রুত কাজ শুরুর উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্প থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পটিও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির প্রায় ৩০ শতাংশ সংযোগ কার্যকর হয়েছে। বাকি ৭০ শতাংশ সংযোগ এখনো সম্পন্ন হয়নি।
গুলশান, বারিধারা ও বনানী এলাকার পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত করতে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। এ অর্থায়নে চীনের সহযোগিতা পাওয়া গেলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ কমবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রয়োজনীয় অর্থ ঋণ অথবা অনুদান হিসেবে দেওয়ার বিষয়েও চীনের আগ্রহের কথা জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেও চীনের সহযোগিতা ও বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং গ্রামীণ হাটবাজারসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ খাতে নির্দিষ্ট কোনো অর্থের অঙ্ক জানানো হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী চীনের বিভিন্ন ব্যাংক ও ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করবেন বলে জানানো হয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের আলোচনা চলছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে চীনের সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বৈঠকে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে এর সংযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মোংলা বন্দর উন্নয়নেও চীনের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান মীর শাহে আলম।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বর্তমানে মোংলা বন্দর প্রকল্প ও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে চীন। তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক সফর ও যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ইয়াও ওয়েন বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের ভবিষ্যৎ সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দক্ষতা উন্নয়ন ও ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রেও চীনের সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির জন্য দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিন শেখাতে চীন থেকে প্রশিক্ষক আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এ সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হবে না বলে চীনা পক্ষ জানিয়েছে।