রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন কোটি মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর এই মহানগর দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এই ব্যস্ত নগরীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে একটি নীরব হুমকি ভর করে আছে-ভূমিকম্প। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল প্রস্তুতি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঢাকাকে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। বাংলাদেশের অবস্থান কয়েকটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক ফল্ট লাইনের কাছাকাছি। ফলে মাঝারি থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ রাজধানীতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বহুতল ভবন, যার অনেকগুলোর নির্মাণে যথাযথ নকশা ও ভবন নির্মাণবিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংকীর্ণ সড়ক, অপর্যাপ্ত খোলা স্থান, অবৈধ স্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, ভূমিকম্প নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে। অনেক পরিবার জানে না ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে বা কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখতে হবে। নিয়মিত মহড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এখনই রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ভবন নির্মাণবিধির কঠোর বাস্তবায়ন, পুরোনো ও দুর্বল স্থাপনার নিরাপত্তা মূল্যায়ন, পর্যাপ্ত খোলা স্থান সংরক্ষণ এবং জরুরি সেবা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দুর্যোগ-সচেতন হতে হবে এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। ভূমিকম্প কখন হবে, তা আগাম নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; কিন্তু এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া পুরোপুরি আমাদের হাতেই। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা। প্রস্তুতি হয়তো প্রাণহানি কমাবে না, বরং দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি সহনশীল ও নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে।