শিক্ষা প্রতিটি শিশুর সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। কিন্তু দেশের নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোই প্রতিদিন এক কঠিন সংগ্রাম। রাজবাড়ীর সদর উপজেলার মিজানপুর ও বরাট ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা সেই চিত্রই তুলে ধরে। বছরের একটি বড় সময় তাদের নৌকায় করে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি, তীব্র স্রোত ও বড় ঢেউ এই যাত্রাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চরাঞ্চলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন নদী পার হয়ে স্কুল, মাদরাসা কিংবা কলেজে যায়। বর্ষাকালে পারাপারের সময় ও ঝুঁকি-দুই-ই বেড়ে যায়। অনেক দিন প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তারা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। অভিভাবকেরাও সন্তানদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্কুলে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেন। এর প্রভাব উপস্থিতির হার কমে যাওয়া, শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণও একই বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। বর্ষা শুরু হলে চরাঞ্চল থেকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে পাঠ্যক্রমে পিছিয়ে পড়া, পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা নিশ্চিত করতে হলে ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি, চরাঞ্চলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। এ দাবি বাস্তবসম্মতভাবেই বিবেচনার দাবি রাখে। একই সঙ্গে নিরাপদ নৌযান, নির্ধারিত স্কুলবোট, ঘাটের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুর্যোগকালীন বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা চালুর বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক সুবিধা বা মৌসুমি শিক্ষাকেন্দ্রের মতো উদ্যোগও বিবেচনা করা যেতে পারে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের বাস্তবতায় চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ভিন্ন হলেও শিক্ষার অধিকার ভিন্ন হতে পারে না। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হওয়া কাম্য নয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যাতে বর্ষা আর শিক্ষার পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে না দাঁড়ায় এবং প্রতিটি শিশুই নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।