দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা নির্ধারণ, চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (২৬ জুলাই) বিকেল ৪টায় চা শ্রমিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি অজিত রায় বাড়াইকের সভাপতিত্বে এবং সাংগঠনিক সম্পাদক অধীর বাউরীর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন বাসদ (মার্কসবাদী) সিলেট জেলা সাংগঠনিক কমিটির সমন্বয়ক সঞ্জয় কান্ত দাস, লাক্কাতুরা চা বাগানের শ্রমিক নেতা রঘু দাস, কালগুল চা বাগানের যুব নেতা রবি ছত্রী, হিলুয়াছড়া চা বাগানের রবি মাল, কেওয়াছড়া চা বাগানের সঞ্জীব কুর্মি এবং মালনীছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত সদস্য মালতি যাদবসহ অন্যান্য নেতারা। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহীদ মিনার থেকে আম্বরখানা পয়েন্টে গিয়ে শেষ হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলন চললেও সরকার ও মালিকপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে চা শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ টাকা করার একটি বিল উত্থাপিত হলেও শ্রমমন্ত্রীর ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বিষয়টি আলোচনার আশ্বাসের পর বিলটি প্রত্যাহার করা হয়। পরে শ্রমমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যে চা শ্রমিকরা বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
তাদের দাবি, বর্তমানে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা, যা দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব নয়। বক্তাদের ভাষ্য, পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের শুধু খাদ্য ব্যয় মেটাতেই প্রতিদিন সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা প্রয়োজন। তাই ৬০০ টাকা মজুরির দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং ন্যূনতম জীবনধারণের দাবি।
বক্তারা আরও বলেন, প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন চা উৎপাদনকারী দেশে বাংলাদেশের তুলনায় শ্রমিকদের মজুরি অনেক বেশি। উৎপাদন ব্যয় প্রায় সমান হলেও বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা সবচেয়ে কম মজুরি পান। তারা দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ পূর্ণাঙ্গ রেশন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান। সমাবেশে মালিকপক্ষের মজুরি সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবিরও সমালোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী বাসস্থান, চিকিৎসা, আলো, পানি কিংবা অন্যান্য সামাজিক সুবিধাকে মজুরির অংশ হিসেবে গণ্য করা যায় না। অথচ মালিকপক্ষ এসব সুবিধার আর্থিক মূল্য দেখিয়ে প্রকৃত মজুরি বেশি বলে প্রচার করছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। বক্তারা ২০২৩ সালের চা শ্রমিকদের মজুরি সংক্রান্ত গেজেটকে শ্রমিকস্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, ওই গেজেটে মূল মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির বিধান রাখা হয়েছে এবং বোনাসসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কমানো হয়েছে। বর্তমান সরকারও এখন পর্যন্ত গেজেটটি বাতিলের উদ্যোগ নেয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন। এছাড়া, আট বছর ধরে স্থগিত থাকা চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন দ্রুত আয়োজন, ভূমির অধিকার নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ চা শ্রমিকদের মৌলিক মানবিক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান বক্তারা।
সমাবেশ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, অবিলম্বে দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা নির্ধারণসহ উত্থাপিত দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে চা শ্রমিক, ছাত্র-যুবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।