৬০ বছর পর অনার্স খোলার অনুমতি পেল মহাদেবপুর জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজ

এফএনএস (রওশন জাহান; মহাদেবপুর, নওগাঁ) : | প্রকাশ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:২০ পিএম
৬০ বছর পর অনার্স খোলার অনুমতি পেল মহাদেবপুর জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজ

প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পর অবশেষে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা সদরের জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজে অনার্স পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয় খোলার অনুমতি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গত ৪ অক্টোবর এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করে। এতে অন্যান্য কলেজের সঙ্গে জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজে অনার্স পর্যায়ে ইংরেজি, গণিত, অর্থনীতি, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনা বিষয় খোলার লক্ষে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। জাতীয় সংসদের নওগাঁ-৩ (মহাদেবপুর-বদলগাছী) আসনের এমপি ফজলে হুদা বাবুলের এ সংক্রান্ত গত ৯ জুন তারিখের আধাসরকারি পত্রের (ডিও) পরিপ্রেক্ষিতে এই অনুমতি দেয়া হয় বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই অনুমতি অনার্স কোর্স খোলার একদম প্রাথমিক পদক্ষেপ। জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজ ইতোমধ্যেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত হওয়ায় অন্যান্য প্রক্রিয়া সহজ হবে। মন্ত্রণালয়ের এই অনুমতির পর এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় কোড বরাদ্দ ও আসন সংখ্যা অনুমোদনের প্রক্রিয়ার জন্য আবেদন করতে হবে। আবেদনের প্রেক্ষিতে কলেজ পরিদর্শক সরেজমিনে পরিদর্শন করে সম্ভাব্যতা যাচাই করে রিপোর্ট দিবেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এই রিপোর্ট উত্থাপন করা হবে। বিষয়টি সেখানে নিস্পত্তি হলে ওইসব বিষয়ে অনার্স পর্যায়ে পাঠদানের চুড়ান্ত অনুমতি দেয়া হবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজের পুরাতন ভবন, একাডেমিক ভবন, বিজ্ঞান ভবন, বায়োলজি, কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স ভবন, লাইব্রেরী, অডিটোরিয়াম, আর্টস বিল্ডিং ছাড়াও একটি ছয়তলা নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অনার্সের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খোলার জন্য প্রয়োজনীয় ক্লাস রুম, লাইব্রেরী, ল্যাব ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। তবে রয়েছে তীব্র জনবল সংকট। কলেজটিতে বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যাণিজ্য বিভাগে মোট এক হাজার ১০০ জন এবং স্নাতক পর্যায়ে বিএ ও বিএসএস বিভাগে ৭৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব বিষয়ে পাঠদানের জন্য ২৪ জন শিক্ষকের পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১১ জন। এছাড়া ১৩ জন কর্মচারির পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫ জন। অনার্স কোর্স চালু হলে বিষয়ভিত্তিক অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

জানতে চাইলে, জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. লোকনুজ্জামান আহম্মেদ বলেন, ওই নয়টি বিষয় ছাড়াও বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং দর্শনসহ মোট ১৩টি বিষয় খোলার প্রক্রিয়া চলছে। সব কিছু ঠিকঠাক চললে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী ২০২৭-‘২৮ শিক্ষাবছরে অনার্সে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম শুরু হতে পারে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভর্তি বিজ্ঞপ্তির সাথে এই কলেজের নামও অন্তর্ভূক্ত হবে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৭ সালে। সেবছর ৩১ জুলাই ‘জাহাঙ্গীরপুর কলেজ’ নামে এর নামফলক উন্মোচন করেন রাজশাহীর তদানিন্তন জেলা প্রশাসক এম, এ, সাঈদ। এর মূল উদ্যোক্তা নওগাঁর তদানিন্তন মহকুমা প্রশাসক আজিজুল হক। এটি প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন জমিদার ক্ষিতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরী। ১৯৮৩ সালের শেষদিকে তদানিন্তন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মহাদেবপুর কলেজ মাঠে আয়োজিত এক সমাবেশে ভাষণ দানকালে কলেজটিকে সরকারিকরণ করা হলো বলে ঘোষণা দেন। পরের বছর ৯ জানুয়ারি থেকে এটি ‘জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তখন পর্যন্ত এখানে শুধুমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় ছিল। ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর কলেজটিকে এর অধিভূক্ত করা হলে স্নাতক (পাশ) পর্যায় চালু হয়। এরপর বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়েছে একইভাবে। জেলার অন্য সব উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি কলেজে স্নাতক (সম্মান) পর্যায় চালু হলেও মহাদেবপুরে তা চালুর উদ্যোগ নেননি কেউ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নওগাঁ সদরে নওগাঁ সরকারি কলেজ ও নওগাঁ সরকারি বিএমসি মহিলা কলেজে ১৯৯৬ সালে, নওগাঁ আস্তান মোল্লা কলেজে ২০১৩ সালে, পত্নীতলা উপজেলায় নজিপুর সরকারি কলেজে ২০১০ সালে, সাপাহার উপজেলায় সাপাহার সরকারি কলেজে ২০১১ সালে, বদলগাছী উপজেলায় বদলগাছী সরকারি কলেজে এবং আত্রাই উপজেলায় মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজে ২০১২ সালে, মান্দা উপজেলায় মান্দা মোমিন-শাহানা সরকারি কলেজে ২০১৩ সালে, পোরশা উপজেলায় পোরশা ডিগ্রি কলেজে ২০১৫ সালে এবং নিয়ামতপুর উপজেলায় নিয়ামতপুর সরকারি কলেজে ২০১৬ সালে অনার্স পর্যায় চালু হয়। এই অবস্থায় নওগাঁ-৩ আসনের এমপি ফজলে হুদা বাবুল ডিও লেটার দিয়ে মহাদেবপুরে অনার্স কোর্স চালুর উদ্যোগ নেয়ায় এলাকার সর্বস্তরের মানুষের ভালবাসা অর্জন করেছেন। বিভিন্ন মহল তাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। এই উদ্যোগে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে