সরাইলে সিন্ডিকেট করে সারের মূল্য বৃদ্ধির অভিযোগ

এফএনএস (মাহবুব খান বাবুল; সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : | প্রকাশ: ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
সরাইলে সিন্ডিকেট করে সারের মূল্য বৃদ্ধির অভিযোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে প্রকাশ্যে গোপনে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সার। কৌশলে গুদামবন্দির মাধ্যমে সারের ক্রাইসিস দেখিয়ে বস্তা প্রতি ৪০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত বেশী নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০০৯ সালে তৈরী কাগজে ৩২ ডিলার, ৭৯ সাব ডিলারের (খুচরা) তালিকা থাকলেও অধিকাংশের অস্তিত্ব নেই বাস্তবে। গুটি কয়েক প্রভাবশালী ব্যক্তির মুষ্টিতেই বন্দি হয়ে আছে সরাইলের সার। নকল সারের কথাও চাউর হচ্ছে কৃষকের মুখে। মঙ্গলবার কালীকচ্ছ বাজারে সার ক্রয়ের সঠিক মূল্য বলায় কৃষক সিরাজুল ইসলামকে গালমন্দ করেন বিক্রেতা হেলাল মিয়া। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার অধিক মূল্যে সার বিক্রির সময় হাতেনাতে ধরে শাহবাজপুরে এক বিক্রেতাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন নির্বাহী কর্মকর্তা মীর কামরূজ্জামান কবির। তারপরও অধিক মূল্যের চাপে কাহিল স্থানীয় কৃষকরা। তারা বলছেন, এখানে সিন্ডিকেট করে কৌশলে শোষণ করছেন কৃষকদের রক্ত। চাহিদা বেশী থাকায় অনেক বিক্রেতা সার অন্যত্র সরিয়ে মজুদ করছেন। ‘সার নেই, মূল্য বেশী’ শুনে হতাশ হয়ে অনেক কৃষক ছুটছেন অন্য এলাকায়। 

সরজমিন অনুসন্ধান, কৃষি অফিস, ভুক্তভোগি কৃষক ও স্থানীয় সূত্র জানায়, এবার সরাইল উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। এ পরিমাণ জমির জন্য পর্যাপ্ত সার দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। সরকার নির্ধারিত সারের মূল্য হচ্ছে- ইউরিয়া প্রতি কেজি ২৭ টাকা (৫০ কেজির বস্তা ১৩৫০ টাকা), টিএসপি কেজি ২৭ টাকা, এমওপি কেজি ২০ টাকা ও ডিএপি কেজি ২১ টাকা (বস্তা ১০৫০ টাকা)। কৃষকের সার প্রাপ্তির জন্য সরাইলে ২০০৯ সালে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিসিআইসি’র ১৬ জন ও বিএডিসি’র ১৬ জন ডিলার। কাগজে কলমে অস্তিত্ব আছে ৫-৭ জনের। অন্যদের সার কে উত্তোলন করছেন? কোথায় যাচ্ছে? এই প্রশ্ন কৃষকদের। চুন্টায়, কালীকচ্ছ ও শাহজাদাপুর ইউনিয়নে ট্যাগ করা হয়েছে আশুগঞ্জ উপজেলার মেসার্স আবীর পরিবহন সংস্থা, মেসার্স বাগদাদ পরিবহন সংস্থা, মেসার্স মলাই মিয়া, মেসার্স সবুজ বাংলা নামের সংস্থা গুলোকে। কাগজে পরিস্কার লেখা এ ৪টির বাস্তব ঠিকানা একই জায়গায় আশুগঞ্জ ফেরিঘাট। সরাইলে তাদের কোন অফিস ঠিকানা বা অস্তিত্ব ছিল না এখনো নেই। এছাড়া ৩২ জনের মধ্যে মাত্র ৫-৭ জন ডিলারের নড়াচড়া রয়েছে। আর সার উত্তোলন করেন ২/১ জন। একেক জন ৮-১০ জনের সার উত্তোলন করে মনগড়ামত সমগ্র উপজেলায় সাব ডিলারদের কাছে সার বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যেক ইউনিয়নে (প্রতি ওয়ার্ডে ১ জন করে) নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৯ জন করে সাব-ডিলার (খুচরা)। চুন্টায় ১ জন কম থাকায় উপজেলায় রয়েছে কাগজে রয়েছে ৭৯ জন। বাস্তবে আরো কম। তাদের প্রত্যেকের জামানত ৩০ হাজার টাকা। নিয়ম মাফিক ৩২ জন ডিলারের কাছ থেকে সার নিয়ে কৃষকের কাছে বিক্রি করবেন ৭৯ জন সাব ডিলার। তবে সাব ডিলার নিয়োগেও নানা অনিয়ম তুল ধরছেন কৃষকরা। অনেকেই নিস্ক্রীয়, এক পরিবারের একাধিক সদস্য, এক পয়েন্টে ২/৩/৪ জন, এক ওয়ার্ডের বাসিন্দা আরেক ওয়ার্ডের ডিলার হয়ে বসে আছেন বছরের পর বছর। আবার কেউ সার পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না। কৃষকদের অভিযোগ এবার খুচরা ডিলারদের কাছে সার প্রাপ্তি ও মূল্যে চলছে নানা কারিশমা। সার কম বা আপাতত নেই বলে ক্রাইসিস দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশী মূল্য হাঁকাচ্ছেন। এতে করে নাভিশ্বাস উঠছে কৃষকদের। সরজমিনে গেলে কালিকচ্ছ ইউনিয়নের সূর্যকান্দি গ্রামের কৃষক নজির মৃধা বলেন, বর্ডার বাজারের সাত্তারের দোকান থেকে টিএসপি স্যার ৪০ টাকা কেজি (২ হাজার টাকা বস্তা) মূল্যে ক্রয় করেছি। সেখানে ইউরিয়া ৩৫ টাকা কেজি আর লাল সারটা ১৬০০ টাকা বস্তা। আরো দেড় মন সার লাগবে। চড়া মূল্যে মন খারাপ হয়ে গেল। তারা সারের অধিক মূল্য রেখে জঘন্য অন্যায় করছে। শুনেছি চানপুরসহ বিভিন্ন বাড়িঘরে সার মজুদ করে রেখেছেন। একই ইউনিয়নের বাসিন্দা অর্জুন চক্রবর্তী দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত সারের মূল্য বিষয়ক নিউজে কমেন্স করেছেন, “এদের চার্টে লেখা দর কেজি প্রতি সার ২১ টাকা কিন্তু বস্তা ১৬০০ তে কিনলাম। কেজি পরলো ৩২ টাকা। দোকানিদের নাকি তারপরেও লস। ব্যবসায়িদের লসের যোগান দিতে হয় প্রান্তিক কৃষককে। কি অবস্থা! ব্যানারে লেখা দরের কথা বললে বলে এই রেটে বিক্রি করলে নাকি তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। জরিমানার পরও দাম কমেনি বাজারে।” গত মঙ্গলবার কালীকচ্ছ বাজারের বিক্রেতা হেলাল মিয়ার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের ৫ বস্তা সার ক্রয় করেন নন্দীপাড়া গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম। ক্রয় মূল্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, টিএসপি ২ হাজার আর ইউরিয়া ১৬’শত টাকা রেখেছেন। ক্রয়ের সঠিক মূল্য বলে দেয়ায় ছটে গিয়ে সিরাজুল ইসলামকে গালমন্দ শুরূ করেন বিক্রেতা হেলাল। চুন্টা ইউনিয়নের ঘাগড়াজোর গ্রামের বাসিন্দা সাব-ডিলার মো. আবুল মিয়া ক্ষোভের সাথে বলেন, এখানে আরমান ট্রেডার্স ও আবিরের প্রকৃত লোকজনের কোন অস্তিত্ব নেই। এদেরকে আমরা কখনো দেখিনি। সাজানো অন্য লোক দিয়ে চলছে। এরা সংশ্লিষ্ট ডিলারের যোগসাজশে ইচ্ছেমত দাম বাড়িয়ে প্রতি বস্তা সার ১৭-১৮’শত টাকায় বিক্রি করছে। ২০০৯ সালে থেকে সাব-ডিলার হলেও অজানা কারণে আমাকে এক বস্তা সারও দিচ্ছেন না। । অপরাধ আমি কেন আগে কম মূল্যে কৃষককে সার দিতাম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক বলেন, তারা মূল রশিদ দেয় না। ক্রেতা থেকে রাখা টাকার প্রকৃত পরিমাণও উল্লেখ করেন না। তাদের প্রিন্ট করা অংশ বাদে একটি সাদা কাগজে একেবারে সরকারি মূল্যটা লিখে ক্রেতাকে দেন। শাহবাজপুর ইউনিয়নের ধীতপুর গ্রামের প্রবোধ সরকার বলেন, প্রত্যেতটা সারের দামই বেশী। তবে ডেপটার (ডিএপি) দাম অনেক বেশী। সরাইল সদরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মাহফুজ মিয়া বলেন, আমি এক বস্তা ডেপ স্যার ক্রয় করেছি ১৯’শত টাকায়। শাহজাদাপুর ইউনিয়নের মলাইশ গ্রামের রাখাল দাস বলেন, সারের দাম চড়া। সিন্ডিকেট হয়ে গেছে। ইউরিয়া ১৫’শত আর টিএসপি ২৪’শত টাকা বস্তা। সম্পর্কের কারণে অনেক সময় কথা বলতে পারি না। কৃষি কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কেউ উপস্থিত থাকলে কৃষককে বলে পরে আসুন। মোড়াহাটি গ্রামের ফোর মিয়াসহ একাধিক কৃষক বলেন, মলাইশ বাজার থেকে গত বুধবার সার ক্রয় করেছি। তারা ইউরিয়া ১৫’শত, টিএসপি ১৮’শত ও বিএডিসি’র ডিএপি(ডেপ) ১৭’শত টাকা বস্তা রেখেছে। একই গ্রামের হেলাল মিয়া বলেন, মলাইশে সারের মূল্য বেশী হওয়ায় নরসিংদীর শিবপুরের বারিচা থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এনেছি। গাড়িভাড়া দিয়েও এখান থেকে অনেক কম পড়েছে। কৃষি অফিসের লোকজন সার বিক্রেতার এখানে না বসে কৃষক বের করে জিজ্ঞেস করলেই সত্যটা পাবেন। উনারা কেন জানি সেটা করছেন না। পাকশিমুল ইউনিয়নের জয়ধরকান্দি গ্রামের কৃষক হাবিদ মিয়া বলেন, আমান উল্লাহ পাঠানের কাছ থেকে প্রতি বস্তা সার ১৬’শত ও ২১’শত টাকায় ক্রয় করেছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, সরাইলে সার উত্তোলন, বিক্রি, সিন্ডিকেট, মজুদ, বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে ২/১ জন ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করছেন। কাগজপত্র, পছন্দের সাব-ডিলার, সারের পরিমাণ নির্ধারণ, উপর ম্যানেজে সহায়তা করছেন অফিসের কতিপয় ব্যক্তি। সকল খরচ হিসাব করে উনাদের ইচ্ছায়ই সারের মূল্য বাড়ে। খেসারত দিতে হয় কৃষককে।   

সরাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও সার বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মো. একরাম হোসেন কতিপয় সাব-ডিলার অধিক মূল্যে সার বিক্রির বিষয়টি শুনার কথা স্বীকার করে বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্যে বিক্রির কোন বিধান নেই। নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়ে আমরা প্রস্তুত ও ঘুরে ফিরে মনিটরিং করছি। কৃষকরা অভিযোগ করলে ও সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিব। সরাইলে অস্তিত্বহীন আশুগঞ্জের ৪ ডিলারের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখেছি। দ্রূতই ব্যবস্থা নিবেন। তবে শুধু কাগজে ২৬ ডিলারের মধ্যে অধিকাংশই বাস্তবে নেই। এদের সার কে উত্তোলন করেন? এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান তিনি। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মীর কামরূজ্জামান কবির বলেন, একজনকে তো হাতেনাতে ধরে জরিমানা করেছি। এ ছাড়া জেলার কর্মকর্তা সহ আমরা সর্বক্ষণ গুরূত্ব সহকারে ঘুরেফিরে মনিটরিং করছি। ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত সকল উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি সর্বক্ষণ তদারকি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ তারা সকল ডিলারকে ভালোভাবে চিনেন। এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। ধরা পড়লেই আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে