উপসহকারি প্রকৌশলী হয়েও ৬ বছর ধরে দপ্তর প্রধানের চেয়ারে মাকসুদ এম.এ হান্নান, (পটুয়াখালী -দুমকি) মো. মাকসুদুর রহমান। উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে পটুয়াখালীর বাউফলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকেশৈলীর কার্যালয়ে কর্মরত আছেন। সহকারী প্রকৌশলীর পদ শূন্য থাকায় দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলীর। তবে তা দুই এক বছর নয়, প্রায় ৬ বছর ধরে কর্তার চেয়ারে বসে আছেন তিনি।
যদিও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা- কর্মচারী তিন বছরের বেশি সময় একই কর্মস্থলে থাকতে পারেন না। শুধু তাই নয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে তাকে বার বার অন্যত্র বদলি আদেশ দেওয়া হলেও অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাব ঘাটিয়ে একই কর্মস্থলে আসীন এই উপসহকারী প্রকৌশলী। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও একাধিক সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের শুরুর দিকে বাউফলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে যোগদান করেন মাকসুদুর রহমান। সহকারী প্রকৌশলীর পদ শূন্য থাকায় দায়িত্ব পান ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলীর। উপসহাকারী হয়ে কার্যালয়ের প্রধান বনে গিয়ে হয়ে উঠেন বেপরোয়া।
নিজের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য আ.স.ম ফিরোজ, উপজেলা চেয়ারম্যান মোসরেফ হোসেন খান সহ শীর্ষ নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। মাকসুদ হয়ে উঠেন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তার একক নিয়ন্ত্রণে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তর অনিয়ম দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত হয়। সরকারি নিময় অনুযায়ী তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকতে না পারলেও প্রায় ৬ বছর ধরে একই কর্মস্থলে আসীন আছেন। আওয়ামী লীগের আমলে তাকে একাধিক বার বদলিও আদেশ দেয় জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তখন সাবেক সংসদ সদস্য আ.স.ম ফিরোজের মাধ্যমে বদলি আদেশ বাতিল করেন।
২৪,র ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতন হলে ভোল্ট পাল্টি ফেলেন চতুর মাকসুদ। ইউটান নিয়ে স্থানীয় জামায়াত ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে নতুন করে সর্ম্পক গড়েন। সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে নেতাদের সাথে সর্ম্পক সুদৃঢ় করেন। যার প্রভাবে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। বিভিন্ন সময় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম হলেও বহাল তবিয়তে অদৃশ্য ক্ষমতার অধিকারী এই উপসহকারি প্রকৌশলী।
মাকসুদের যত অনিয়ম
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় অনিয়মকে নিয়মে পরিনত করেছেন। নিয়মিত অফিসে থাকেন না মাকসুদ। তার বিরুদ্ধে গভীর নলকূপ স্থাপণ ও পানি সরবরাহ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সারাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার কালাইয়া ও কালিশুরী বন্দরে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। নির্মাণ কাজে নিম্ন মানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, শিডিউল অনুযায়ী কাজ না করা, বৃষ্টির মধ্যে পানির ট্যাঙ্কির ঢালাই ও রাতের আঁধারে কাজ করার অভিযোগে উঠে । কাজের তথ্য চাইতে একাধিক বার কার্যালয়ে গেলেও সাংবাদিকদের তথ্য দেয়নি তিনি। এমনকি অভিযোগের বিষয়ে জানানোর পরেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, দুটি কাজের তদারকের দায়িত্বে রয়েছেন উপ-সহকারি প্রকৌশলী মাকসুদ। সাব ঠিকাদার হিসেবে একই লোক কাজ দুটি করছেন। তাকে (মাকসুদ) ম্যানেজ করেই নির্মাণ কাজে অনিয়ম করছেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।
এদিকে, প্রতিবছর স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনূকুলে বিশেষ বরাদ্দ, এডিপি ও রাজস্ব প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিপর্যায়ে গভীর নলকূপ স্থাপণ করা হয়। যার অধিকাংশ নলকূপের প্লাটফরম (চাতাল) নির্মাণ না করে বরাদ্দের টাকা আত্মসাত করেন বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠে।
দাশপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল হক বলেন,‘ ২০২৪ সালে সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপ স্থাপণ করা হলেও এখন পর্যন্ত প্লাটফরম তৈরি করে দেওয়া হয়নি। একাধিক বার বলার পরেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে কার্যালয়ের সাবেক এক কর্মচারী জানান, গভীর নলকূপ স্থাপণের পর অধিকাংশ টিউবওয়েলে পাকা ফ্লাটফরম (চাতাল) নির্মাণ না করে বরাদ্দের টাকা ঠিকাদারের সাথে সমঝতা করে আত্মাসাত করেন মাকসুদ। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপসহকারী প্রকৌশলী মাকসুদুর রহমানের দপ্তরে গেলে তিনি তিনি বলেন,‘ নিউজ করার দরকার নেই, তথ্যও নেওয়ার দরকার নেই। আমি এমনিতেই চলে যাব।’ আর কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি তিনি। ব্যস্ততা দেখিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেন।
বিষয়টি পটুয়াখালী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ৭ মাস আগে তাকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। পরে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তা স্থগিত করা হয়। যেহেতু সে ৫ বছরেরও বেশি সময় একই কর্মস্থলে রয়েছেন। এবিষয়ে মন্ত্রণালয় দ্রুত ব্যবস্থা নিবেন।
অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, গভীর নলকূলের বিষয়ে বাউফল নিয়ে প্রায় অভিযোগ আসে। এখন অনেকটা অভিযোগ কমেছে। যে কারণে ফাইন বিল চূড়ান্ত করার আগে আমি কিছু টিউবওয়েল চেক করিয়ে নেই। আবার যারা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, তাদের টিউবওয়েলের প্লাটফরম নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এবিষয়ে যদি কোনো অভিযোগ আসে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর পানি সরবরাহ প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, বৃষ্টির মধ্যে নির্মাণ কাজ করার যে ভিডিও গণমাধ্যমে এসেছে তা আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যদি কাজে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয় , তাহলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।