শিল্প, বিনিয়োগ ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত উন্নয়নের অভাবে সীতাকুণ্ডের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশ এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। একদিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও ইস্পাতশিল্প, অন্যদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড়, পাহাড়ি ঝরনা ও গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতের মতো আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রÑসব মিলিয়ে অঞ্চলটি হতে পারে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সীতাকুণ্ডকে অর্থনৈতিক হাব ও আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক লায়ন এম. আসলাম চৌধুরী এফসিএ। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে গত শনিবার বিকেলে সীতাকুণ্ডের এল কে সিদ্দিকী স্কয়ারে উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি আয়োজিত মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর প্রস্তাবনায় রয়েছে ভারী শিল্পের আধুনিকায়ন, নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং চন্দ্রনাথ-গুলিয়াখালীকে ঘিরে পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন।
আসলাম চৌধুরী বলেন, সীতাকুণ্ডের পাহাড়, সমুদ্র, শিল্পাঞ্চল ও ভৌগোলিক অবস্থানকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে এ অঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি।
শিল্পাঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়ে তিনি তরুণদের প্রচলিত ডিগ্রিনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কর্মজীবী নারী ও বয়স্ক নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও তাঁর পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং, স্টিল মেল্টিং ও রি-রোলিং শিল্পকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও শ্রমিকের জন্য নিরাপদ করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সমাবেশে তুলে ধরা হয়। শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ ও উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন নেতারা।
পর্যটন খাতের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে চন্দ্রনাথ পাহাড়, পাহাড়ি ঝরনা ও গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন আসলাম চৌধুরী। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো, পর্যাপ্ত পর্যটকসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়বে। এর সঙ্গে স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহণ, ক্ষুদ্র ব্যাবসা ও উদ্যোক্তা খাতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। সমাবেশে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য তুলে ধরে আসলাম চৌধুরী বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব দেশের স্বাধীনতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় অধ্যায়। দেশপ্রেমিক সিপাহী ও জনতার ঐক্যের মধ্য দিয়ে সেদিন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন জাতীয় সংহতির প্রতীক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি আরও বলেন, সীতাকুণ্ড বিএনপির তৃণমূলের ঐক্যই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। অতীতে হাইকমান্ডকে বিভ্রান্ত করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হলেও ত্যাগী নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কারণে তা সফল হয়নি। ভবিষ্যতেও যেকোনো ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা মোকাবিলায় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। সীতাকুণ্ডের দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন বক্তারা। ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে সামাজিক বিভাজন কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা প্রতিহত করার ঘোষণা দেন তাঁরা। সব ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণি-পেশার মানুষের সমান নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টিও সমাবেশে উঠে আসে। বক্তারা দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে সমাবেশ শেষ হয়।
সীতাকুণ্ড পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে এবং উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মোরসালিনের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ড. কমল কদর, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম জহুর, যুগ্ম আহ্বায়ক সালামত উল্লাহ, ফজলুল করিম চৌধুরী, পৌরসভা বিএনপির সদস্য সচিব ছালে আহমদ ছলু, ইউসুফ নিজামী, মোজাহির উদ্দিন আশরাফ, নুর উদ্দিন জাহাঙ্গীর চেয়ারম্যান, দিদারুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট রোশনারা বেগম ও শহিদুল্লাহ ভূঁইয়াসহ স্থানীয় নেতারা।