শুভ সন্ধ্যা বনের নিলামকৃত গাছের সাথে অর্ধশতাধিক গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগ

এফএনএস (মোঃ আব্দুল মোতালিব; তালতলী, বরগুনা) :
| আপডেট: ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম | প্রকাশ: ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
শুভ সন্ধ্যা বনের নিলামকৃত গাছের সাথে অর্ধশতাধিক গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগ
ছবি: FNS

বরগুনার তালতলীতে নলবুনিয়া বিটের শুভ সন্ধ্যা এলাকার সংরক্ষিত’ বনাঞ্চলের নিলামকৃত ঝড়ে পড়া গাছে কেটে নেয়ার সময় অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলামের যোগসাজশে নিলামের শর্ত ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রভাব খাটিয়ে এসব গাছ কেটে নিয়েছেন।

বর্ণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী উপকূলীয় বর্ণ বিভাগের অধীন আমতলী রেঞ্জ (তালতলী) কেন্দ্রের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বনের ঝরে পড়া গাছ বিক্রির জন্য চলতি বছরের ০১ জুলাই উপকূলীয় বর্ণ বিভাগের বিভাগীয় বর্ণ কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে গাছের লট নং-০৫ ও ০৬ এর অনুকূলে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গাছ বিক্রির কার্যাদেশ দেওয়া হয়। 

দরপত্র বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, লটের মূল্য ৫৯,৪৭০ টাকা, ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ৮,৯২১ টাকা এবং ১০ শতাংশ আয়কর বাবদ ৫,৯৪৭ টাকাসহ মোট ৭৪,৩৮৮ টাকা রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে পরিশোধ করার পর ক্রেতা মো. সোহেল রানাকে লট ক্রয় করেন। নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের চর রতনের পূর্ব পার্শ্বের বাগান এলাকায় অবস্থিত ৫ নম্বর লটে ২৫টি গাছ (মার্ককৃত ক্রমিক নং ০১-২৫) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাতে মোট ৭৮.৩৫ ঘনফুট কাঠ ও ৪৮.০ ঘনফুট জ্বালানি রয়েছে। একই এলাকার ৬ নম্বর লটে আরও ২৫টি গাছ (মার্ককৃত ক্রমিক নং ২৬-৫০) রয়েছে, যাতে ৭০.১৯ ঘনফুট কাঠ ও ৪২.০ ঘনফুট জ্বালানি রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লট ক্রয়ের কার্যাদেশ অনুযায়ী- চলতি বছরের ০১ জুলাই থেকে ১০ জুলাই গাছ কাটার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু কার্যাদেশ অমান্য করে গত ১০ অক্টোবর নিলামকৃত গাছ কেটে নিয়ে যান ক্রেতা সোহেল রানা। পরবর্তীতে, নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে বাকি গাছ কাটা সম্ভব হয়নি জানিয়ে অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্র উত্তাল থাকার কারণ দেখিয়ে গত ১২ অক্টোবর সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেন তিনি। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে, ২৮ অক্টোবর উপকূলীয় বর্ণ বিভাগের বিভাগীয় বর্ণ কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বর্ধিত করেন। গত ০৬ নভেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় নলবুনিয়া ফরেষ্ট ক্যাম্পের চর রওশনের পূর্ব পর্শ্বে বাগান এলাকায় সরাসরি বর্ণ বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই নিলামকৃত ঝড়ে পড়া গাছের আড়ালে অর্ধশতাধিক জীবত গাছ কেটে ট্রলার নিয়ে যাচ্ছে নিলাম ক্রয়কৃত ব্যক্তি সোহেল রানা। এসময় নিলামকৃত ঝড়ে পড়া গাছে বর্ণ বিভাগের নির্দিষ্ট মার্ক থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ গাছে কোনো মার্ক বা সিল দেখা যায়নি। এছাড়াও বিভিন্ন গাছে একই ক্রমিক নম্বর দিয়ে মার্ক করার অনিয়ম দেখা গেছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে বনের মূল্যবান আকাশমনি, ঝাউগাছ, বাবলা গাছসহ অবাধে জীবিত গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে বনবিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গাছ কাটার আলামত নষ্ট করতে গাছের গোড়ায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে দেখা যায়। খবর পেয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে একাধিক জীবিত গাছ কাটা অবস্থায় দেখলেও মাত্র ১ টি গাছের ৪ খণ্ড জব্দ করেন।

স্থানীয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, 'রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম নিলাম ক্রয়কৃত ব্যক্তির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বনের জীবন্ত গাছ কাটার সুযোগ করে দিয়েছেন। এমনকি খবর পেয়ে ঘটনাস্থল এসেও তিনি রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেননি।'

অভিযোগের বিষয়ে নিলামে গাছ ক্রয়কারী সোহেল রানা বলেন, 'নিলামের মাধ্যমে আমড়া কেবল ঝড়ে পড়ে যাওয়া গাছগুলোই কেটেছি। এর বাইরে কোনো জীবন্ত গাছ কাটা হয়নি। এছাড়া, আগুন লাগানোর ঘটনার সাথে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং কে বা কারা এই আগুন দিয়েছে, সে বিষয়েও আমাদের কিছু জানা নেই।'নলবুনিয়া ফরেষ্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত বিট কর্মকর্তা জহিরুল হক বলেন, ‘পূর্বের বিট কর্মকর্তা যাওয়ার পরে আমি কিছুদিন আগে দায়িত্ব নিয়েছি। একই ক্রমিক নম্বর একাধিক গাছে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, 'যিনি গাছগুলো মার্ক (চিহ্নিত) করেছেন, এটি তাঁর ভুল ছিল।" তবে বর্তমান সময়ে ঠিক কত পিস গাছ কাটা হয়েছে এবং কত পিস নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে এড়িয়ে যান।'অভিযোগ অস্বীকার করে বনবিভাগের আমতলী রেঞ্জ (তালতলী) কেন্দ্রের রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম বলেন, 'আমি এখানে যোগদানের আগেই এই গাছের নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তাই এখান থেকে আমার কোনো সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।'

তবে জীবন্ত গাছ কাটা ও বনে আগুন দেওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি আরও বলেন, 'ঘটনাস্থল থেকে আকাশমনি গাছের ৪টি খণ্ড উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি, বনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।'

এবিষয়ে বনবিভাগের বরগুনা কার্যালয়ের সহকারী বর্ণ সংরক্ষক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন ভূঞা বলেন, 'নলবুনিয়া ক্যাম্পে অনুমোদিত দুটি লটের আওতায় মোট ৫০টি গাছ আহরণের কার্যক্রম চলমান ছিল। এর ধারাবাহিকতায় নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ১টি আকাশমনি গাছ অবৈধভাবে কর্তন করার বিষয়টি ধরা পড়ে। প্রাথমিকভাবে ঘটনার সাথে নলবুনিয়া ক্যাম্পের একজন কর্মচারীর সরাসরি যোগসাজেশ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।'

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে