অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই ২১ কোটি টাকার এআই প্রশিক্ষণ প্রকল্প পেলেন মাসুদ আলম

এফএনএস প্রতিবেদক শাহজাহান স্বপন: | প্রকাশ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:২২ পিএম
অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই ২১ কোটি টাকার এআই প্রশিক্ষণ প্রকল্প পেলেন মাসুদ আলম

ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অথচ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোটি কোটি টাকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বরাবরই একচ্ছত্র আধিপত্য তাঁর। সরকার বদলালেও সেই আধিপত্যে চিড় ধরেনি। অতীতের অনিয়মের সব অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে এবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন অধিদপ্তরের প্রায় ২১ কোটি টাকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণ প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ আলম।

দৈনিক আমাদের দিন-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত সরকারের আমলে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে কোটি টাকার প্রকল্প বাগানো এই বিতর্কিত ব্যক্তিকেই এবার এআই প্রকল্পের ‘লিড এজেন্সি’ ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ চার বিভাগের প্রশিক্ষক হিসেবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের তরুণ-তরুণীদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে ‘তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যুবদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি নেওয়া হয়। চার অঞ্চলে ভাগ করে সারা দেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য গত ১৯ জুলাই দরপত্রের চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এতে ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের দুটি বড় প্যাকেজ (প্যাকেজ ১ ও ৩) দেওয়া হয়েছে মাসুদ আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডকে।

চার বিভাগে এআই প্রশিক্ষণের দায়িত্ব  

প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় বেকার তরুণ-তরুণীদের বিনামূল্যে ৩০০ ঘণ্টার আধুনিক এআই ও জেনারেটিভ প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা। এ ছাড়া অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ২০০ টাকা হারে যাতায়াত ও খাবার ভাতা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। 

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা, ময়মনসিংহসহ চার বিভাগে প্রশিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের ভাতা বণ্টন ও সামগ্রিক কার্যক্রমের দায়িত্ব মাসুদের প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে দরপত্রের শর্তে সূক্ষ্ম কারসাজি করা হয়েছে। এর আগেও যুব অধিদপ্তরের ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্পে প্রশিক্ষণার্থীদের অস্তিত্বহীন তালিকা বানিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এমনকি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে জালিয়াতির তথ্য উঠে আসে। তা সত্ত্বেও চার বিভাগের মতো বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের প্রশিক্ষণ তাদের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে খোদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের একাংশের মধ্যেই চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক যোগাযোগ ও পুরস্কার

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন মাসুদ আলম। ওই সময়ে প্রতিমন্ত্রীর ছত্রচ্ছায়ায় মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রশিক্ষণ প্রকল্প একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। প্রভাব খাটিয়ে মাসুদ বিভিন্ন সামাজিক ও প্রযুক্তি ফোরামের নেতৃত্বও কবজা করেন। 

রাজনৈতিক এই সখ্যতার জোরে ২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি সমর্থনপুষ্ট ‘বাংলাদেশ যুব কাউন্সিল’-এর সভাপতির পদও বাগিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও অধিদপ্তরে থাকা বিগত আমলের সুবিধাভোগী অসাধু চক্রের সহায়তায় বহাল তবিয়তে আছেন মাসুদ আলম। পুরোনো নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়েই তিনি ২১ কোটির এই প্রকল্পেও প্রভাব বিস্তার করেছেন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম *দৈনিক আমাদের দিন*-কে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষের সাজানো। সাবেক প্রতিমন্ত্রীর এলাকার লোক হিসেবে সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছবি থাকা অপরাধ নয়। দরপত্রের সব শর্ত পূরণ করেই উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় আমরা কাজ পেয়েছি। কোনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়নি।’

এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নিয়মের মধ্য থেকেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অতীতে কোনো অনিয়মের প্রমাণ থাকলে বা বর্তমান প্রকল্পে সামান্যতম গাফিলতি দেখা গেলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে