মধুমতির ভাঙনে বিলীনের পথে মোল্লাহাটের চিত্র, স্থায়ী বাঁধ ফিরিয়ে আনার দাবি

এফএনএস (এম এম মফিজুর রহমান; মোল্লাহাট, বাগেরহাট) : | প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
মধুমতির ভাঙনে বিলীনের পথে মোল্লাহাটের চিত্র, স্থায়ী বাঁধ ফিরিয়ে আনার দাবি

বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলায় মধুমতি নদীর অব্যাহত ভাঙনে ক্রমেই অস্তিত্বসংকটে পড়ছে নদীতীরবর্তী জনপদ। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা ও রাস্তাঘাট। ভাঙনে ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নতুন করে ঝুঁকির মুখে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা, কবরস্থান, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। অন্যদিকে, নদীর নাব্যতা সংকট ও নৌপথের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। এ পরিস্থিতিতে মধুমতির ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সুরক্ষা এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন চললেও কার্যকর ও টেকসই প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পরিবার হারিয়েছে কৃষিজমি ও বসতভিটা। ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও বহু পরিবারকে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হতে পারে। এ অবস্থায় সোনাপুরা, চর আটজুড়ী, গিরিশনগর, গাড়ফা, উদয়পুর, আস্তাইল ও সিঙ্গাতী গ্রামকে ভাঙন প্রতিরোধের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।ঝুঁকিতে জনপদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্য: মধুমতি নদীর ভাঙন এখন শুধু বসতবাড়ি ও কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি এলাকার শিক্ষা, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে। নদীগর্ভে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হওয়ার পর অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ এবং স্থানীয় শিশুদের শিক্ষার সুযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ধর্মীয় স্থাপনা, কবরস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ঝুঁকির মুখে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব স্থাপনা এলাকার মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহাসিক স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় দ্রুত ঝুঁকি নিরূপণ ও কার্যকর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা। নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ভাঙন ঠেকানো না গেলে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে বহু পরিবার জীবিকা সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হলে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জরুরি সেবা গ্রহণেও দুর্ভোগ বাড়বে।স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি: স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের মতে, বালুর বস্তা ফেলা কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলে দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীর স্রোত, তীরের মাটির গঠন ও ভাঙনের ধরন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত ও টেকসই নদীতীর সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।স্থানীয় এক ইউপি সদস্য বলেন, “প্রতিদিন নদী ভাঙছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ঘরবাড়ি, জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।”তাঁর মতে, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করতে হবে। স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব, খননের পরিকল্পনা নেই: নদীভাঙনের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে জানিয়ে মোল্লাহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমনা আইরিন বলেন, “বিষয়টি আমি এবং আমাদের ডিসি স্যার অবগত আছেন। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।”বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল জানান, মোল্লাহাটের গাড়ফা বাজার ও সোনাপুরা অংশের নদীভাঙন রোধে ১৪২০ মিটার (প্রায় দেড় কিলোমিটার) বাঁধ নির্মাণের একটি প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। তবে এই মুহূর্তে মধুমতি নদী খননের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান তিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ উদ্যোগকে কিছুটা হলেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তবে তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা হলে এর মধ্যেই আরও জমি, বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। তাই প্রস্তাব অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ ও কাজ শুরুর প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।নাব্যতা সংকট নিরসনেও প্রয়োজন উদ্যোগ: ভাঙন প্রতিরোধের পাশাপাশি মধুমতি নদীর নাব্যতা সংকট নিরসনকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, নদীর বিভিন্ন স্থানে পলি জমে নাব্যতা কমে গেলে নৌযান চলাচল ও পণ্য পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। নৌপথের কোনো অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।এ অবস্থায় নদীর গভীরতা, পানিপ্রবাহ, পলি জমার পরিমাণ এবং নৌযান চলাচলের বর্তমান পরিস্থিতি নিরূপণে কারিগরি জরিপের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় স্থানে পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত খনন বা ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ যেন ভাঙনপ্রবণ নদীতীরের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি না করে, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। নদীর তলদেশের গঠন, স্রোতের গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা বিবেচনায় নিয়ে নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ এবং নাব্যতা উন্নয়নের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করার ওপর জোর দিয়েছেন স্থানীয়রা।সমন্বিত পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা: স্থানীয়দের মতে, মধুমতি নদীর সমস্যা সমাধানে শুধু তীরভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, নাব্যতা উন্নয়ন ও নৌপথ সচল রাখার বিষয়গুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড, নৌপরিবহন-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।পাশাপাশি ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ও স্থাপনা চিহ্নিতকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা, কবরস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।নদীতীরবর্তী মানুষের প্রত্যাশা: প্রস্তাবিত বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ দ্রুত অনুমোদন পাবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু হবে। তবে দীর্ঘদিনের ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রস্তাবিত বাঁধের পাশাপাশি পুরো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কারিগরি মূল্যায়নও জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।মধুমতির ভাঙন থেকে বসতভিটা, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রক্ষা এবং নদীর নাব্যতা ও নৌ-যোগাযোগের সম্ভাবনা ধরে রাখতে এখন কার্যকর, সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপের অপেক্ষায় মোল্লাহাটের নদীতীরবর্তী মানুষ। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে নদীভাঙনের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে