সার সংকট কৃত্রিম, লংমার্চে অপচয় হচ্ছে জ্বালানি: পীরগঞ্জে শাহে আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম
সার সংকট কৃত্রিম, লংমার্চে অপচয় হচ্ছে জ্বালানি: পীরগঞ্জে শাহে আলম
ছবি: সংগ্রহীত

রংপুরের পীরগঞ্জে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সার ও জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে একাধিক বক্তব্য দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত ও বাড়ি পরিদর্শন থেকে শুরু করে দুপুরে সড়ক উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ, সার সংকট এবং সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সমালোচনা করেন তিনি।

সকালে পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে যান মীর শাহে আলম। সেখানে তিনি আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণে বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণ, মা-বাবার থাকার ব্যবস্থা এবং কবরস্থানের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ১ কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এই অর্থ ব্যয় করা হবে জানিয়ে জেলা প্রশাসককে নকশা তৈরির নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

মীর শাহে আলম বলেন, আবু সাঈদ গণ-অভ্যুত্থানের বীর এবং তাঁর আত্মত্যাগ তরুণ সমাজ ও ছাত্র-জনতার জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর ভাষায়, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে আন্দোলন সারা দেশের মানুষকে রাজপথে নামিয়েছিল, তা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, “আমরা আবু সাঈদকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই।”

রংপুর জেলা স্টেডিয়ামের নাম ‘শহীদ আবু সাঈদ স্টেডিয়াম’ করার আগ্রহের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এরই মধ্যে স্টেডিয়ামটির নাম ‘শহীদ আবু সাঈদ স্টেডিয়াম’ করা হয়েছে।

এ সময় উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনা দূর করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী, স্বাস্থ্য কার্ড, খাল খনন, কর্মসংস্থান ও খেলাধুলার উন্নয়নসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা উঠে আসে।

মীর শাহে আলম বলেন, দেশের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্মানী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে সম্মানীর অর্থ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কর্মসূচিটি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পর্যায়ক্রমে দেশের ৪ কোটি পরিবারের নারী প্রধানকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে আগামী চার বছরে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। কৃষকদের ভূমিহীন, প্রান্তিক, মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিবেচনা করে কার্ড দেওয়া হবে এবং এ জন্য তদবিরের প্রয়োজন হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এর আগে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সার সংকট নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। দেশে সারের সংকট নেই দাবি করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সংকট না থাকলেও ১০ থেকে ১১টি জেলায় কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

মীর শাহে আলমের অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারকে হেয় করার জন্য দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে এসব এলাকায় হইচই করে সারের কৃত্রিম সংকট দেখানো হচ্ছে। যেসব এলাকায় সংকটের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে বিদ্যমান ডিলারদের পাশাপাশি নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতে তিনি সার সরবরাহের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রয়োজনে নিজে ডিলারদের গুদাম পরিদর্শন করে সার মজুত আছে কি না এবং তা সঠিকভাবে কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও দেখবেন।

বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, এটি সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যা এবং এর সমাধানে সময় প্রয়োজন। তাঁর দাবি, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধু দায় ও সময় বাড়িয়েছে, দেশের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দুপুর ১২টার দিকে পীরগঞ্জ উপজেলার বড়দরগাহ থেকে ভেন্ডাবাড়ী সড়ক শক্তিশালীকরণ ও মেরামতকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রতিমন্ত্রী। পরে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত পথসভায় তিনি বলেন, বিএনপি সারা দেশে সুষম উন্নয়নে বিশ্বাস করে এবং রংপুরেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়া হবে। আগামী সাড়ে চার বছরে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল মানুষ দেখতে পাবেন বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমরা আপনাদের বেহেশতের গ্যারান্টি দিতে পারব না। বেহেশত পেতে হলে মহান আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। আমরা আপনাদের উন্নয়নের গ্যারান্টি দিতে চাই।”

১১ দলীয় জোটের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই থেকে তিন হাজার গাড়ি নিয়ে লাখ লাখ লিটার তেল ও গ্যাস ব্যবহার করে লংমার্চের নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে তৈরি সংকট বর্তমান সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

একই সঙ্গে সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে সরকার পতনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, জনগণের সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত সরকারকে সহজে সরানো যাবে না। তাঁর ভাষায়, সরকার পাঁচ বছর জনগণের জন্য কাজ করতে চায় এবং এরপর জনগণের কাছে ভোট চাইবে। কাজ পছন্দ হলে মানুষ ভোট দেবে, পছন্দ না হলে দেবে না, সিদ্ধান্ত জনগণই নেবে।

জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের উদ্দেশে তিনি বলেন, এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যাতে শেখ হাসিনার ফিরে আসার পথ তৈরি হয়। শেখ হাসিনাকে আর ক্ষমতায় ফিরতে দেওয়া হবে না এবং এ ধরনের কোনো ষড়যন্ত্রও জনগণ মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সড়ক উন্নয়নকাজের বিষয়ে বলা হয়, বড়দরগাহ থেকে ভেন্ডাবাড়ী সড়ক শক্তিশালীকরণ ও মেরামত হলে ওই এলাকার মানুষের যাতায়াত আরও সহজ ও নিরাপদ হবে। পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে অনুষ্ঠানে আশা প্রকাশ করা হয়।

পরে একই অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড ও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এসব সুবিধার বিনিময়ে ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, চাকরি ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, রাস্তাঘাট ও সেতুসহ উন্নয়নের প্রয়োজনীয় কাজ সরকার করবে। তবে ধানের শীষে ভোট না দিলে সরকারের পক্ষ থেকে অসন্তোষ তৈরি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলামের সংসদ সদস্য হতে না পারার প্রসঙ্গও তোলেন মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, সাইফুল ইসলাম ও তিনি একসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। সাইফুল ইসলাম সংসদ সদস্য হলে মন্ত্রী হতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, সাইফুলসহ বিএনপির যারা সংসদ সদস্য হতে পারেননি, তাঁদের কষ্ট তাঁর নিজের এবং প্রধানমন্ত্রীরও রয়েছে।

মীর শাহে আলম দাবি করেন, গত ছয় মাসে পীরগঞ্জ উপজেলায় ২২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সামনে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন রয়েছে উল্লেখ করে এসব নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচিত করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এভাবে সমর্থন পেলে ভেন্ডাবাড়ী উপজেলা গঠন এবং বাকি সড়কগুলোর উন্নয়নকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

দিনের কর্মসূচিতে প্রতিমন্ত্রী রংপুরের বড়দরগাহের সংস্কারকাজ পরিদর্শন করেন এবং জেলার আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সভায় অংশ নেন। বিকেলে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও যোগ দেন তিনি।

শহীদ আবু সাঈদের বাড়ি পরিদর্শন ও অন্যান্য কর্মসূচিতে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুন্নবীর ডন, জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেজেকা সুলতানা ফেন্সি, শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনসহ স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে