সরকারের ওপর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:২৫ এএম
সরকারের ওপর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ

সরকারের ওপর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ। মেয়াদ পূর্ণ হতে যাওয়া চলতি অর্থবছরে বিল-বন্ডের দায় পরিশোধের আর্থিক সামর্থ্য সরকারের নেই। ফলে তা পরিশোধ করতে হবে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে ঋণ নিয়ে। ফলে ঋণ চক্রে জড়িয়ে পড়ায় আরো দায় বাড়বে সরকারের। আর ঋণ চক্রে ঋণের স্থিতি না কমে দিন দিন বাড়তে থাকে। চলতি অর্থবছরেই প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদ পূর্ণ হতে যাচ্ছে। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেশি। তার মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ও শরিয়াহভিত্তিক সুকুকও রয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়া ওসব ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি সরকারকে নিতে হবে নতুন ঋণও। আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের বেশি ঋণ গ্রহণে বেসরকারি খাতে আরো বেশি নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকার বাড়াতে পারছে না প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ। সেজন্যই সরকারকে নিতে হচ্ছে বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি মাত্রায় ঋণ। কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া ঋণের অনেক বেশি সুদহার। আর এ মুহূর্তে চলতি অর্থবছরে মেয়াদ শেষ হওয়া ট্রেজারি বিল-বন্ডের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সরকারের নেই। বরং সরকারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া উচ্চ সুদের ঋণ। চলতি অর্থবছরে সরকার রাজস্ব আরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। যদিও বাস্তবে এতো পরিমাণ রাজস্ব আয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানির তীব্র সংকট চলছে। যার প্রভাবে আরো নাজুক পড়েছে বেসরকারি খাতের পরিস্থিতি। যা সরকারের রাজস্ব আহরণের পরিস্থিতিকে আরো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। চলতি বাজেটে সরকার ঋণের সুদ খাতে ব্যয়ের লক্ষ্য ধরেছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর ওই সুদের ৭৫ শতাংশই অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে চলে যাবে। ফলে রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের সুদহার বৃদ্ধি সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

সূত্র জানায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পূর্ণ হবে মোট ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদ। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ট্রেজারি বিল। তার পরিমাণ ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। তাছাড়া মেয়াদপূর্তির তালিকায় রয়েছে ৭১ হাজার ৯৬০ কোটি ৯৪ লাখ টাকার ট্রেজারি বন্ড। একই সাথে চলতি অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুকুক ও ১ হাজার ৯৯২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার শর্ট টার্ম বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজের (এসপিটিবি) মেয়াদও পূর্ণ হবে। তার আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া সরকারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিরো ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। ওই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারকে পরিশোধ করতে হবে এমন ট্রেজারি বিল-বন্ড ও সুকুকের পরিমাণ বেড়েছে ৭১ শতাংশেরও বেশি। চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি সিকিউরিটিজের স্থিতি হয়েছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। অথচ তিন মাস আগে গত মার্চেও ওই স্থিতির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের শেষ তিন মাসে (মার্চ-জুন) সরকারি সিকিউরিটিজের স্থিতি ৬০ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বেড়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে নেয়া সরকারের এ ঋণের ২২ শতাংশ ট্রেজারি বিলের। বর্তমানে ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিল প্রচলন রয়েছে। আর দুই থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে ঋণ স্থিতি রয়েছে ৬৭ শতাংশ। বাকি ১১ শতাংশ সুকুক ও বিশেষ বন্ডের বিপরীতে সরকার ঋণ নিয়েছে।

সূত্র জানায়, ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়লেও গ্রহণ করা হচ্ছে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প। ফলে সময়ের সঙ্গে সরকারের ওপর ঋণ বোঝাও বাড়বে। বিগত ২০০৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের ঋণ স্থিতি ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারের ওই ঋণ স্থিতি প্রায় ১৯ লাখ কোটি টাকা দাঁড়ায়। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা ছিল। বর্তমানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ায় দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। কেবল জুনে দেশে আমদানি ব্যয় ৭১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ওই মাসে দেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে ৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ৭৫১ কোটি ডলার দাঁড়ায়। আর ২০২৪ সালের জুনে তা ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার ছিলো। মূলত জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় আরো বাড়িয়েছে সরকারের ঋণনির্ভরতা। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এ পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। ওই বেতন বাড়ালে সরকারের ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার ব্যয় বাড়বে। ফলে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩৪ শতাংশেরও বেশি। যদিও একই সময়ে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন। বেসরকারি খাতে ঋণ খরা বর্তমানে আরো তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঘোষণা করা হয় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ। যদিও এখনো শুরু হয়নি সব প্যাকেজের বাস্তবায়ন। তবে ঋণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে তিন বছরের মধ্য অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়াবে প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকা। ফলে দেশের সার্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে বড় ধরনের চাপ বাড়াবে। ধারণা করা হচ্ছে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। পরবর্তী অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে এ ঋণ স্থিতি ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। আর বিশাল ওই ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎসের অবদান ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি থাকবে ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।

এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। আর ওই বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়া হবে। সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে নেয়া হবে ওই ঋণ। সর্বশেষ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছর শেষে সংশোধিত বাজেটে ওই লক্ষ্য বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। যদি শেষ পর্যন্ত সংশোধিত বাজেটের চেয়েও বেশি ঋণ সরকার ব্যাংক থেকে নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকেই সরকার ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। আর একই সময়ে পরিশোধ করেছে সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ। ওই হিসাবে গত জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া নিট ঋণ ছিল ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যদিও অর্থবছরের কোন সময়ে কী পরিমাণ ট্রেজারি বিল-বন্ডের মেয়াদ পূর্ণ হবে তা বিবেচনা করেই বাজেটে নিট ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়। প্রাক্কলনের তুলনায় সরকারের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হলে তা সংশোধিত বাজেটে সমন্বয় করা হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া বিল-বন্ডের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইতিমধ্যে বাজার থেকে ঋণ উত্তোলন শুরু হয়েছে। আর জুলাইয়ের ধারাবাহিকতায় আগস্টেও রেকর্ড পরিমাণ ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলাম হয়েছে। তাতে নতুন করে আরো বাড়ছে সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া ঋণের মেয়াদ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণের জোগান দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। বাংলাদেশ সে দায়িত্ব পালন করছে। তবে ওই ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে তা ভাবতে হবে সরকারকেই।